আফগানিস্তানে তালেবানের মন জয়ের চেষ্টা কেন করছে ভারত :
ভারত তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার বা তাদের মন জয়ের চেষ্টা করছে, এমন কথার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। তালেবানের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের পর আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে তাদের প্রভাবশালী ভূমিকা বেড়েছে, যা ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিচে সম্ভাব্য কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো:
১. আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা:
তালেবানের উত্থানের ফলে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। ভারতের উদ্বেগের বড় কারণ হলো আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বাড়তে পারে। তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভারত এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।
২. জিওপলিটিকাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা:
চীন ও পাকিস্তান ইতোমধ্যে তালেবানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করেছে। চীন আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চাইছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবানের মিত্র। ভারত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে থাকতে চায় না এবং তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়।
৩. অর্থনৈতিক স্বার্থ:
আফগানিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখতে পারে। ভারত ইতোমধ্যে চাবাহার বন্দর ও ইরান-আফগানিস্তান-ভারত করিডোর নিয়ে কাজ করছে। আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা এবং তালেবানের সহযোগিতা এই প্রকল্পগুলোকে কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারে।
৪. মানবিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি:
তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানে মানবিক সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করেছে। এটি ভারতের নরম শক্তির (soft power) ব্যবহার, যা সম্পর্ক উন্নত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি ইতিবাচক বার্তা পাঠায়।
৫. ভারতীয় প্রকল্প ও বিনিয়োগের সুরক্ষা:
ভারত আফগানিস্তানে বিগত দুই দশকে প্রচুর প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে, যেমন আফগান সংসদ ভবন, সড়ক নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি। তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে ভারত এই প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
৬. ভারতীয় সংখ্যালঘু ও নাগরিকদের নিরাপত্তা:
আফগানিস্তানে বসবাসরত শিখ ও হিন্দু সম্প্রদায় এবং সেখানে আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ভারতের অন্যতম লক্ষ্য।
৭. আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ:
তালেবানকে বাদ দিয়ে আফগানিস্তানের বিষয়ে কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন। ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, যাতে সেখানে কোনো শূন্যতা তৈরি না হয় যা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো পূরণ করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ভারত তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে তার ভূমিকা শক্তিশালী করতে এবং নিজের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে।

Post a Comment